সত্য ও সুন্দরের প্রতি আহ্বান

রিজিক নিয়ে ভাবনা? রিজিকের দায়িত্ব মহান আল্লাহর

রিজিক নিয়ে ভাবনা? রিজিকের দায়িত্ব মহান আল্লাহর

রিজিক নিয়ে ভাবনা?

রিজিকের দায়িত্ব মহান আল্লাহর

رِزْقٌ (রিজক) আরবি শব্দ, এর অর্থ: জীবনসামগ্রী, জীবন যাপনের উপায় উপকরণ।

রিজিক এর বাংলা অর্থ : [রিজিক্‌, রিজিক্‌, রেজেক্‌] (বিশেষ্য) জীবনোপকরণ; অন্ন-বস্ত্র প্রভৃতি।

রিজিক কোনো সম্মান বা মর্যাদার মাপকাঠি নয় :

জীবিকা তথা রিজিক কোনো সম্মান বা মর্যাদার মাপকাঠি নয়; আবার মন্দভাগ্য বা অশুভ লক্ষণের আলামতও নয়। কী অনুগত, কী অবাধ্য, কী মুমিন, কী কাফের, কী ভালো, কী মন্দ- সবাইকে জোয়ারভাটার ন্যায় প্রাচুর্র্য ও অভাব, সুখ ও দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে। এর মাধ্যমে আল্লাহপাক অবাধ্য ও কাফেরকে অবকাশ দেন আর অনুগত ও মুমিনের পরীক্ষা নেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যদি আল্লাহর নিকট মাছির ডানার সমান দুনিয়ার মূল্য থাকত, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না’ (তিরমিজি : ২৩২০)। অন্য হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য ফিতনা রয়েছে, আমার উম্মতের ফিতনা হচ্ছে মাল’ (তিরমিজি : ২৩৩৬)।

জীবন চলার পথে রিজিক :

জীবন চলার পথে রিজিক তথা জীবিকা জীবনের অপরিহার্য উপাদান। জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবিকা ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ, অচল ও অসম্ভব। কম বেশি সবার প্রয়োজনীয় জীবিকা দরকার। খাদ্য-পানীয়, সহায়-সম্বল, অর্থকড়ি, সন্তান-সন্ততি ও ধনসম্পদ- যা আমরা ভোগ করি, সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। রিজিক আল্লাহপাক নিজ অনুগ্রহে সৃষ্টিজগৎকে দান করেন এবং জন্মের আগে তা আমাদের ভাগ্যে বণ্টন করে রেখেছেন। আমরা সর্বদা জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। ধনসম্পদ নিয়ে টেনশন করি। অনাগত ভবিষ্যতের চিন্তায় চিন্তিত থাকি। পরিবার-পরিজন ও ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি। টাকা-পয়সার বিষয় সামনে এলেই ব্যতিক্রম, স্বার্থপর ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি। সবসময় ভাবতে থাকি, আগামীতে কী করব? কী খাব? কীভাবে চলব? ইত্যাদি, ইত্যাদি।

জীবিকা প্রসঙ্গে আল্লাহপাকের বানী:

জীবিকা প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘পৃথিবীতে চলমান সকল প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। তিনি তাদের অবস্থানস্থল ও সংরক্ষণস্থল জানেন। সবকিছুই এক স্পষ্ট গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে’ (সূরা হুদ : ৬)। অন্যত্র আল্লাহপাক বলেন, ‘কোনো প্রাণীই জানে না, আগামীতে সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না তার মৃত্যু কখন কোথায় হবে’ (সূরা লোকমান : ৩৪)। আসমান ও যমীন থেকে কে তোমাদের রিয্ক দেন? (সূরা ইউনুস:৩১)। আমিই তোমাদেরকে রিয্ক দেই।(সূরা আল-আন’আম:১৫১)

রিজিক ও মউত- এ দুটি বিষয় অনেক আগে থেকে নির্ধারিত ও মীমাংসিত : 

আধুনিক ও সভ্য পৃথিবী আজ ব্যস্ত ও অস্থির দুটি জিনিসের পেছনে- এক. রিজিক তথা জীবিকার অন্বেষণ। দুই. মউত তথা মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা। অথচ অবধারিত সত্য হচ্ছে- এ দুটি বিষয় অনেক আগে থেকে নির্ধারিত ও মীমাংসিত। জীবিকার জন্য মানুষ কত কিছুই না করছে! চিরসত্য হচ্ছে- ভাগ্যে যা লিপিবদ্ধ আছে, এর বাইরে কেউ কিছু অর্জন করতে পারে না। শত সহস্র চেষ্টা করেও রায্যাক কর্তৃক বাজেটের বাইরে যাওয়া কোনো মাখলুকের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রকৌশলীর পরিকল্পনা ও নকশার বাইরে যেভাবে নির্মাণ শ্রমিকদের যাওয়ার সুযোগ নেই, অনুরূপভাবে রব তথা রায্যাকের নকশা ও বণ্টনের বাইরেও সৃষ্টিজগতের যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি বরাদ্দের বাইরে কোনো এজেন্সি, কর্মকর্তা ও কর্মচারী যেতে পারে না, অনুরূপভাবে মহান রবের বাজেট তথা বরাদ্দের বাইরেও মাখলুক যেতে পারে না। এজন্যই সচরাচর দেখা যায়- একই ব্যবসায় কেউ সফল, আবার কেউ ব্যর্থ। একই কর্মে কেউ কৃতকার্য, আবার কেউ অকৃতকার্য। সমান পরিশ্রম করে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ পিছিয়ে যাচ্ছে। একই গবেষণায় কেউ সফল, আবার কেউ বিফল। একই বাহনে কেউ আহত, কেউ নিহত; আবার কেউ জীবিত ও সুস্থ! জন্ম, জীবিকা, বিবাহ ও মৃত্যু- এগুলো মহান রব তথা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, রহস্য ও নিয়ন্ত্রিত মহিমা! অতএব পরিশ্রম, চেষ্টা ও সাধনার পরও যদি কোনো কিছু অর্জন না হয়, তাহলে মনে করতে হবে- তা রিজিক, নসিব তথা ভাগ্যে নেই।

রিজিক নিয়ে হতাশ বা চিন্তিত হওয়া উচিত নয় :

চিরসত্য রিজিক ও মৃত্যু- এ দুটি বিষয় বান্দার ইচ্ছাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তা একমাত্র মহান রব তথা প্রতিপালকের হাতে। এজন্য হতাশ বা চিন্তিত হওয়া উচিত নয়। সর্বাবস্থায় আল্লাহর ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা হচ্ছে ঈমানের দাবি। হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘গরিব মু’মিনেরা ধনীদের পাঁচশত বছর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (তিরমিজি : ২৩৫৩)। আল্লাহপাক বান্দার জন্য যা ভালো ও মঙ্গলজনক, তাই করেন। যদিওবা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তা বুঝতে পারি না। অতএব কার বরাদ্দ কোথায় রেখেছেন, তা আলেমুল গায়েব আল্লাহই ভালো জানেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমার রব যাকে চান জীবিকা বাড়িয়ে দেন, আবার সংকুচিত করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর বান্দাদের সব খবর রাখেন এবং সবকিছু দেখেন’ (৩০ : ১৭)।

রিজিক মানে শুধু ধনসম্পদে সচ্ছল হওয়া নয় :

রিজিক মানে শুধু ধনসম্পদে সচ্ছল হওয়া নয়, রিজিকের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। বেশির ভাগ মানুষ রিজিক বলতে শুধু ধনদৌলত, অর্থাৎ আর্থিক সচ্ছলতা বোঝেন। সমাজে যাঁরা আর্থিকভাবে সচ্ছল, তাঁদের বেশি রিজিকপ্রাপ্ত এবং যাঁরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তাঁদের কম রিজিকপ্রাপ্ত ভাবা হয়। অথচ ধনসম্পদ বা টাকাপয়সা হলো রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর।

রিজিক হচ্ছে সর্বনিম্ন স্তর :

রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর হলো আর্থিক সচ্ছলতা। এটাই একমাত্র স্তর নয়; রিজিক বলতে শুধু ধনসম্পদ, টাকাপয়সায় সচ্ছলতা অর্জন—এমনটি বোঝা এবং এমন বুঝের ওপর অটল থাকা অজ্ঞতার পরিচায়ক। রিজিকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, দুনিয়াতে যা কিছু মানুষকে উপকৃত করে, সবই রিজিক। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘ধনসম্পদ আর সন্তানসন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৪৬)।

রিজিকের জন্য পেরেশান :

আমরা আজ রিজিকের জন্য পেরেশান। কিভাবে টাকা উপার্জন করা যাবে, সবাই আছি এই চিন্তায়। আমাকে কয়েক কোটি টাকার মালিক হতে হবে; সবসময় মাথায় ঘোরে এই পেরেশানি। তাই টাকার জন্য, গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়ার জন্য চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অথচ কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এমন অনেক জন্তু আছে, যারা আগামীকালের জন্য খাদ্য সঞ্চিত রাখে না। আল্লাহই রিজিক দেন তাদের ও তোমাদেরও। তিনি সর্বশ্রোতা তোমরা যা বলো, আর সর্বজ্ঞ যা তোমরা করো।’ [সূরা আনকাবুত : ৬০] জীবিকার পেছনে সবাই দৌড়ায়। জীবনের জন্য রিজিক অথচ এই রিজিকের জন্য অনেকের জীবন পর্যন্ত চলে যায়।

রিজিক কিন্তু সমান নয় :

সবার রিজিক কিন্তু সমান নয়। কেউ হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে লবণ আনতে পান্তা ফুরায়। আবার কেউ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ বসে বসে খায়। সবাই সমান রিজিক উপার্জন করতে পারে না। আল্লাহপাকের হিকমতের দাবিও তাই। কারণ সবার রিজিক যদি সমান হয়, সবাই যদি সমান অর্থ-সম্পদের মালিক হয়, তাহলে দুনিয়ার আবাদ ও বিশ্ব পরিচালনা ব্যাহত হবে, পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়বে। তাই এর বণ্টন আল্লাহপাক নিজ দায়িত্বে¡ রেখেছেন। তিনি নিজ হিকমত ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সবার মাঝে তা বণ্টন করেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ, রিজিক তথা জীবিকার সন্ধান করবে’ (সূরা জুমআ : ১০)। উল্লেখ্য, সরকারের বাজেট পাস হয় সংসদে আর রবের বাজেট পাস হয় আসমানে। অতএব রিজিক বাড়ানোর জন্য আগ্রহী প্রার্থীকে অবশ্যই আসমানে দরখাস্ত করতে হবে।

রিজিক বৃদ্ধির হাতিয়ার :

রিজিক বৃদ্ধির হাতিয়ার- মহান রবের দরবারে দোয়া ও ইস্তিগফার। নিশ্চয় আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিয্ক প্রশস্ত করেন এবং সঙ্কুচিত করেন(সূরা আর-রুম:৩৭)। তোমরা আল্লাহর রিয্ক থেকে আহার কর ও পান কর এবং ফাসাদকারী হয়ে যমীনে ঘুরে বেড়িয়ো না(সূরা আল-বাকারাহ:৬০)। আর আহার কর আল্লাহ যা তোমাদের রিয্ক দিয়েছেন তা থেকে হালাল, পবিত্র বস্তু। আর তাকওয়া অবলম্বন কর আল্লাহর যার প্রতি তোমরা মুমিন (সূরা আল-মায়েদাহ : ৮৮)। চিরসত্য রিজিক ও মৃত্যু- এ দুটি বিষয় বান্দার ইচ্ছাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তা একমাত্র মহান রব তথা প্রতিপালকের হাতে। সরকারি বাজেট বিভিন্ন এজেন্সি ও সংস্থার মাধ্যমে সরকার জনগণের মাঝে পৌঁছে দেন। অনুরূপভাবে আল্লাহপাক সৃষ্টিজগতের বাজেট সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর কাছে পৌঁছান। এ হচ্ছে বিধাতার বিধান।

 

লেখক, মো: ইয়াছিন আরাফাত

এডমিন, বাংলাদেশ দাওয়াহ সার্কেল

খতিব, গোলারপাড় জামে মসজিদ, ফেনী।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

Verified by MonsterInsights