সত্য ও সুন্দরের প্রতি আহ্বান

আরাফার দিনের ফজিলত ও করণীয়

আরাফার দিন কী? আরাফার দিনের ফজিলত ও করণীয় কী?

আরাফার দিনের ফজিলত ও করণীয়

”আরাফার দিন” ইসলামের একটি পবিত্র দিন যেটি মুসলিম ধর্মের পরিপূর্ণতা লাভের দিবস হিসেবে পরিচিত। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী এই দিনটির নাম ‘ইয়াওমু আরাফা’। এই দিনটি ইসলামিক চন্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে সংগঠিত হয়। এই দিনটির শেষ ভাগে, মুসলিম হজ্জ যাত্রীরা মিনা থেকে যাত্রা করে নিকটবর্তী পাহাড়ের সন্নিকটবর্তী-সমভূমি আরাফাতের ভূমিতে এসে উপস্থিত হন। এই দিনটিতে রাসূল (সা:) জীবনের সর্বশেষ ভাষণ দেন, যে ভাষণকে আমরা বলে থাকি বিদায় হজ্জের ভাষণ।

  • আরাফার দিনের ফযিলত :

১. দ্বীন ও আল্লাহর নেয়ামত পরিপূর্ণ হওয়ার দিন:

সহিহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, أَنَّ الْيَهُودَ، قَالُوا لِعُمَرَ إِنَّكُمْ تَقْرَءُونَ آيَةً لَوْ أُنْزِلَتْ فِينَا لاَتَّخَذْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ عِيدًا ‏.‏ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّي لأَعْلَمُ حَيْثُ أُنْزِلَتْ وَأَىَّ يَوْمٍ أُنْزِلَتْ وَأَيْنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَيْثُ أُنْزِلَتْ أُنْزِلَتْ بِعَرَفَةَ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَاقِفٌ بِعَرَفَةَ ‏.‏

ইয়াহূদী লোকেরা ‘উমার (রাঃ)-কে বলল, তোমরা এমন একটি আয়াত পাঠ করে থাকো তা যদি আমাদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হত, তবে এ দিনটিকে আমরা আনন্দোৎসবের দিন হিসেবে পালন করতাম। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি জানি, ঐ আয়াতটি কখন, কোথায় ও কোন্ দিন অবতীর্ণ হয়েছিল। আর যখন তা অবতীর্ণ হয়েছিল তখন রসূলুল্লাহ (সা:) কোথায় অবস্থান করছিলেন তাও জানি। আয়াতটি ‘ আরাফার  দিন অবতীর্ণ হয়েছিল, রসূলুল্লাহ(সা:) তখন ‘আরাফাতেই অবস্থান করছিলেন।

সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৪১৫ তিনি বললেন: কোন আয়াতটি? সে বলল:  الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا  [المائدة: 3] (অর্থ- আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম।)[সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩]।

২. আরাফার মাঠে অবস্থানকারীদের জন্য এটি ঈদের দিন :

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আরাফার দিন, কোরবানীর দিন ও তাশরিকের দিনগুলো আমরা মুসলমানদের জন্য ঈদ বা উৎসবের দিন। এ দিনগুলো পানাহারের দিন।”[হাদিসটি সুনান গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে] উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ শীর্ষক আয়াতটি নাযিল হয়েছে জুমার দিন, আরাফার দিন। আলহামদু লিল্লাহ উভয় দিন আমাদেরর জন্য ঈদ।

৩. এই দিনকে নিয়ে আল্লাহ তা’আলা কসম করেছেন :

মহান সত্তা মহানকে দিয়ে কসম করে থাকেন। কোরআনুল কারীমে আল্লাহতায়ালা বলেন: ঊষার শপথ! আরো শপথ (জিলহজ মাসের প্রথম) দশ রজনীর! এবং শপথ জোড় (ঈদের দিন) ও বেজোড় (আরাফার দিন) এর (সূরা-৮৯ আল-ফজর, আয়াত: ১-৩)।

এই দিনটি ব্যপারে আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে এরশাদ করে বলেন: “আর প্রতিশ্রুতি দ্রষ্টা ও দৃষ্টের”[সূরা বুরুজ, আয়াত: ৩] এর মধ্যে যেদিনকে বলা হয়েছে- দৃষ্ট। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “প্রতিশ্রুত দিন হচ্ছে- কিয়ামতের দিন। আর দৃষ্ট দিন হচ্ছে- আরাফার দিন। আর দ্রষ্টা হচ্ছে- জুমার দিন।”[সুনানে তিরমিযি; আলবানী হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন]

৪. এই দিন রোযা রাখলে দুই বছরের পাপ মোচন হয় :

জিলহজের ১ থেকে ৯ তারিখ প্রতিদিনের রোজা ১ বছরের রোজার সওয়াব এবং প্রতিরাতের ইবাদত ১ বছরের ইবাদতের সমান সওয়াব। (তিরমিযী, খণ্ড:১, পৃষ্ঠা: ১৫৮)।

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ ‏.

আমি আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট  আরাফাতের দিনের রোযা সম্পর্কে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন।

(জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৭৪৯)

যারা হাজী নন তাদের জন্য এ রোযা রাখা সুন্নত। যারা হাজী তাদের জন্য আরাফার দিন রোযা থাকা সুন্নত নয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার দিন রোযা রাখেননি। তাঁর থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি আরাফার ময়দানে আরাফার দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন।

৫. এইদিনে আল্লাহ তাআলা বনী আদম থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন :

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, “নিশ্চয় আল্লাহ নামানে -অর্থাৎ আরাফার ময়দানে- আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। তিনি আদমের মেরুদণ্ডে তাঁর যত বংশধরদের রেখেছেন তাদের সবাইকে বের করে এনে অণুর মত তাঁর সামনে ছড়িয়ে দেন। এরপর সরাসরি তাদের সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন: আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা সকলে বলে: হ্যাঁ অবশ্যই; আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। এটা এ জন্যে যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম। কিংবা তোমরা যেন না বল, আমাদের পিতৃপুরুষরাও তো আমাদের আগে শির্ক করেছে, আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর; তবে কি (শির্কের মাধ্যমে) যারা তাদের আমলকে বাতিল করেছে তাদের কৃতকর্মের জন্য আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন।”[সূরা আরাফ, আয়াত: ১৭২-১৭৩] (হাদিসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে, আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)।

৬. এটি গুনাহ মাফ ও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির দিন :

সহিহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, “আরাফার দিনের চেয়ে উত্তম এমন কোন দিন নেই যেই দিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন; নিশ্চয় তিনি নিকটবর্তী হন; অতঃপর তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গৌরব করে বলেন: এরা কি চায়?”

ইবনে উমর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ আরাফাবাসীদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গৌরব করে বলেন: আমার বান্দাদের দিকে তাকাও; তারা এলোমেলো চুল ও ধুলোমলিন হয়ে আমার কাছে এসেছে।”[মুসনাদে আহমাদ; আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

৭. জিলহজের মহিমাপূর্ণ একটি দিন হলো নয় তারিখ ‘ইয়াওমু আরাফা’ :

আরবি মাসের সর্বশেষ জিলহজ মাস বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। আর জিলহজের মহিমাপূর্ণ একটি দিন হলো নয় তারিখ। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সেই দিনটির নাম ‘ইয়াওমু আরাফা’।

এ দিনটি হজের মূল দিন। আরাফার হাজি সাহেবদের অবস্থান এ দিনেই হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা এ দিনকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। দ্বীন-ইসলাম পূর্ণতার ঘোষণা দিয়েছেন এ দিনেই। এ দিনেই অবতীর্ণ হয়েছে কোরআনে কারিমের সর্বশেষ আয়াত, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলাম তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম। (সুরা মায়েদা, আয়াত : ০৩)

  • আরাফাতের দিনে করণীয় :

১. সিয়াম পালন করা :

রাসূল (সা:) এরশাদ করেন : আমি আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট  আরাফাতের দিনের রোযা সম্পর্কে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন (জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৭৪৯)।

২. বেশী বেশী দোয়া পড়া :

হাদিসে এসেছে, উত্তম দোয়া হল আরাফা দিবসের দোয়া, এবং আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণের সর্বোত্তম কথা হল—

لَا إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ اْلَحمْدُ وَهَوُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ.

-আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তারই, প্রশংসাও তাঁর। এবং তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।[১] আরাফার ময়দানে এই দোয়াটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)বেশি বেশি পড়েছেন।[২]

[১] -তিরমিযী : হাদিস নং ৩৫৮৫

[২] – আহমদ : হাদিস নং ৬৯৬১

৩. ক্ষমা প্রার্থনা করা :

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন কোন দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে ‘ আরাফার   দিনে র চেয়ে জাহান্নাম থেকে বেশি মুক্তি দিয়ে থাকেন। তিনি সেদিন বান্দাদের খুব নিকটবর্তী হন, তাদেরকে নিয়ে মালায়িকার (ফেরেশতাগণের) কাছে গর্ববোধ করে বলেন, এরা কি চায়? (অর্থাৎ- যা চায় আমি তাদেরকে তাই দেবো)। (মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : মুসলিম ১৩৪৮, মুসতাদ্রাক লিল হাকিম ১৭০৫, ইবনু মাজাহ ৩০১৪, সহীহাহ্ ২৫৫১, সহীহ আল জামি‘ ৫৭৯৬। মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস নং ২৫৯৪

৪. বেশী বেশী জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া :

আল্লাহ তায়ালা মানুষদেরকে জাহান্নাম থেকে এতো বেশী মুক্তি দিয়ে থাকেন, যেমন হাদিস শরীফে এসেছে : জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যিলহজ মাসের দশ দিন থেকে উত্তম আল্লাহর নিকট কোন দিন নেই”। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি বলে: হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনগুলোই উত্তম, না এ দিনগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদসহ উত্তম? তিনি বললেনঃ “জিহাদ ছাড়াই এগুলো উত্তম। আল্লাহর নিকট  আরাফার  দিন থেকে উত্তম কোন দিন নেই, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর জমিনে বাসকারীদের নিয়ে আসমানে বাসকারীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেনঃ আমার বান্দাদের দেখ, তারা হজ্জের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর-দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখে নি। সুতরাং এমন কোনো দিন দেখা যায় না যাতে  আরাফার   দিনে র তুলনায় জাহান্নাম থেকে অধিক মুক্তি পায়”। [ইব্‌ন হিব্বান]

সহিহ হাদিসে কুদসি, হাদিস নং ১০১

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সম্মনিত মাসে, সম্মানিত দিনে সঠিক ভাবে নেক আমল করার তাওফীক দান করুন। (আল্লাহুম্মা আমীন)

লেখক, মো: ইয়াছিন

এডমিন, বাংলাদেশ দাওয়াহ সার্কেল

খতিব, গোলারপাড় জামে মসজিদ, ফেনী।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.