সত্য ও সুন্দরের প্রতি আহ্বান

ইসলাম বনাম পলিটিক্যাল ইসলাম

ইসলাম কী? ইসলাম একটি রাষ্ট্রীয় দীন? আমাদের দীন কী? একজন মুসলমান সেই যে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোত্তম জীবনাদর্শ হিসেবে বিশ্বাস করবে?

ইসলাম বনাম পলিটিক্যাল ইসলাম

ইসলাম আল্লাহপাক প্রদত্ত এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কুরআনের ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন হলো ইসলাম’- আলে ইমরান ১৯। এখানে আদ্ দীন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ইংরেজিতে বলা যায় This is the way, not This is a way. অন্যান্য দীন বা জীবনব্যবস্থার মাঝে ইসলাম একটি; না, এমন নয়। ইসলাম ছাড়া আর যা কিছু তা সবই বাতিল ও তাগুতের (আল্লাহদ্রোহী শক্তি) অনুসৃত। আর আল্লাহপাকের দাবি, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাগুতকে অস্বীকার করো’- সুরা নহল ৩৬। আল্লাহপাককে মানা এবং পাশাপাশি তাগুতকেও মানা- এরই নাম শিরক। মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণ বা কোনো এক সময় ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হলে আদমশুমারিতে সারাজীবন একজন ব্যক্তি মুসলমান থেকে যায় যদি না প্রকাশ্যে ইসলাম ত্যাগ করে নিজেকে অন্য ধর্মাবলম্বী বা নাস্তিক হিসেবে ঘোষণা না দেয়। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহপাকের একটি দপ্তর রয়েছে যেখানে ঈমান ও ঈমানের দাবি অনুসারে নেক আমলই কেবল পরিমাপ করা হয়। আল্লাহপাকের কাছে গৃহিত দীন বা জীবনব্যবস্থা হলো একমাত্র ইসলাম এবং এর সাথে আর কোনো বিশেষণ নেই। চেতনা লাভের পর থেকে মৃত্যু বা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যাস্ত থেকে সূর্যাদয় মানুষের চলার বিধানই হলো ইসলাম এবং একজন মুসলমানের পক্ষে এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যে ব্যক্তি সর্বান্তকরণে আল্লাহপাক প্রদত্ত এবং রসূলুল্লাহ (সা.) প্রদর্শিত পথকে (ইসলাম) আঁকড়ে ধরে নিজের জীবন পরিচালনা করে তাকেই বলা হয় মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী)। আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সা.)-এর কোনো বিধান তার সামনে আসলে সে বলে, ‘আমি শুনলাম ও মেনে নিলাম’- সূরা বাকারা ২৮৫। কোনো প্রশ্ন নেই, অজুহাত নেই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নামই ইসলাম। যে পারে না তার সাথে ইসলাম বা মুসলমানের কোনো সম্পর্ক নেই।

 

ইসলাম একটি রাষ্ট্রীয় দীন। আল্লাহর পক্ষ থেকে যত নবী-রসূল এসেছেন সবারই দায়িত্ব ছিল আল্লাহর জমিনে তাঁর দীনকে বিজয়ী করা। আল্লাহপাক তাঁর নবী-রসূলদের দাঁড় করিয়েছেন সমসায়িক শাসকবর্গের বিরুদ্ধে। নমরুদের বিরুদ্ধে হজরত ইবরাহিম (আ.) এবং ফেরাউনের বিরুদ্ধে হজরত মুসা (আ.)-কে দাঁড় করিয়েছেন। হক ও বাতিলের এই দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম চিরন্তন। সকলেরই দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ দুনিয়ার সকল তাগুতিশক্তিকে অস্বীকার করে কেবল আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নেয়া। কালেমা তাইয়্যেবাহ এক বিপ্লবাত্মক ঘোষণা- তাগুতের মতে একটি পলিটিক্যাল স্লোগান। হ্যাঁ, সত্যিই সকল খোদাদ্রোহী শক্তি এই বাণীটাকে তাদের নিজেদের জন্য হুমকি এবং ক্ষমতা হারানোর ভয় হিসেবে বিবেচনা করে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উত্তরাধিকার যারাই জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার কথা বলে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে তাগুতের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে এবং তাদের এই পলিটিক্যাল ইসলাম তারা কখনই মেনে নেবে না। তাদের দৃষ্টিতে ধর্ম একটি পবিত্র জিনিস। রাজনীতির মতো নোংরা কাজে ধর্মকে টেনে আনা এবং ভালো লোকের এখানে আসা সমীচীন নয়। রাজনীতির এই অপবিত্র অঙ্গনে তাদের মতো চরিত্রহীন মানুষগুলোকেই কেবল মানায়। তারা ছলেবলে কৌশলে সৎ মানুষগুলোকে রাজনীতির বাইরে রেখে এতরফা লুটপাট ও সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে আল্লাহর জমিনকে মনুষ্যবাসের অযোগ্য করে রেখেছে।

 

এই পৃথিবীকে আবাদ করার জন্যই আল্লাহপাক যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রসূল প্রেরণ করেছেন। সকল নবী-রসূলের দায়িত্ব ছিল আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত করা। তাঁর বাণী, ‘দীন কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি করো না’- সূরা শুরা ১৩। শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাকের বাণী, ‘তিনি আপন রসূলকে হেদায়াত ও সত্য- সঠিক জীবনব্যবস্থা (দীনে হক) দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে সকল জীবনব্যবস্থার ওপর একে বিজয়ী করে দিতে পারেন, মুশরিকদের কাছে তা যতই অসহনীয় হোক’- সূরা সফ ৯। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উত্তরাধিকার দেশের আলেম সমাজ ও ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর কাজও অনুরূপ অর্থাৎ সকল দীন ও জীবনব্যস্থার ওপরে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা। দীন কায়েম হওয়ার অর্থ হলো সমাজে আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েম করা। ইসলামকে যারা সীমাবদ্ধ অর্থে ধর্ম হিসেবে মানে তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই বলে থাকে যে, ওরা ধর্মের নামে রাজনীতি করে এবং এভাবে সরলমনা লোকদের ধোঁকা দেয়। সরলমনা লোকগুলো না বুঝলেও একটু জ্ঞানবান যারা তারা ভালোভাবেই বুঝে যে রাজনীতির অঙ্গনে ওরা ধোঁকাবাজ এক একজন ইসলামের শত্রু এবং সুযোগ পেলেই ইসলামপন্থী ও ন্যায়বানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ওদের নেই নীতিবোধ, ওদের মুরব্বী পার্শ্ববর্তী দেশ ও পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহ। ধর্মনিরপেক্ষ জাতিসমূহের সততা, বিশ্বস্ততা ও আমনতদারিতা স্রেফ পলিসি। তারা বিশ্বাস করে যে ‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’ (Honesty is the best Policy.) এসব গুণাবলীর বিনিময়ে আল্লাহপাক তাদেরকে দুনিয়ায় নেতৃত্ব দান করেছেন কিন্তু আখেরাতে তাদের কোনো বিনিময় নেই। তাদের দেশে ভোট চুরি নেই, গুম- খুন নেই, রাষ্ট্রীয় তহবিলতসরুপের ঘটনা নেই। ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য লাগাতার ধর্মঘট নেই বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গুম-খুন, আয়নাঘর ও বিচারিক হত্যাকাণ্ড নেই। কিন্তু তাদের একটি কুৎসিত চরিত্র রয়েছে। পররাজ্য দখল এবং তাদেরকে শত্রু বিবেচনা করে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ মানবতার ধ্বংস সাধনে তারা একটুও বিচলিত নন। তাদের লক্ষ্য দুনিয়া, আখিরাত তাদের কাছে গুরুত্বের দাবি রাখে না। কিন্তু তাদের বিপরীতে আমাদের সততা স্রেফ পলিসি নয়; এর পেছনে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা।

 

আমাদের দীন মসজিদে যেমন পালন করতে হয় ঠিক তেমনি হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে, সংসদ, গণভবন, বঙ্গভবন সর্বত্রই মানতে হবে। আল্লাহর বাণী, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন’- সূরা বাকারা ২০৮। হাটে- বাজারে, অফিস-আদালতে, সংসদ, গণভবন, বঙ্গভবনে আল্লাহকে মানা না হলে সেখানে মানা হয় শয়তানকে এবং যার পরিণতি এই দুঃশাসন। আংশিক মানার পরিণতিও আল্লাহপাক বলে দিয়েছেন, ‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ মানবে এবং কিছু অংশ অমান্য করবে, তাহলে দুনিয়ার জীবনে রয়েছে জিল্লতি ও আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ আজাব’- সূরা বাকারা ৮৫। সারা বিশ্বে আমরা কোনো সম্মানের পাত্র নই। অপমান ও জিল্লতি পদে পদে ভোগ করছি। অথচ আল্লাহপাক আমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দান করেছেন, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠতম জাতি, তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য, তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে’- সূরা আলে ইমরান ১১০। যাদের হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব কেবল তারাই নির্দেশ প্রদান করতে পারে এবং সম্মান ও মর্যাদা তাদেরই। ইবলিসের অনুসারিরা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অধিকারী হবে আর আল্লাহর খলিফারা তাদের আনুগত্য করবে- এটা একজন মুসলমানের জন্য কোনভাবেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কালিমা তাইয়্যেবার দাবি সকল তাগুতকে অস্বীকার করে কেবল আল্লাহকে মানার নামই ঈমান। সেই হিসাবে বলা যায় কালিমা তাইয়্যেবা একটি পলিটিক্যাল স্লোগান যেটার উচ্চারণে তাগুত বেসামাল হয়ে পড়ে এবং অতীতে সকল যুগে হয়েছিল। সোজা-সাপটা বলা যায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু মানি না মানবো না।

 

একজন মুসলমান সেই যে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোত্তম জীবনাদর্শ হিসেবে বিশ্বাস করে, ইসলাম পরিপূর্ণ মেনে চলে, ইসলামকে জমিনে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালায় এবং মনেপ্রাণে ইসলামের বিজয় কামনা করে। এর থেকে কোনো বিচ্যুতি থাকলে এবং সেটি যদি সজ্ঞানে হয়ে থাকে তাহলে সে আর ইসলামের মধ্যে থাকে না। একজন মুসলিম মানে একজন লড়াকু সৈনিক। ইসলামকে রাষ্ট্রীয় দীন হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালায়। আল্লাহ তায়ালার বাণী, ‘যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই তোমরা শয়তানের সঙ্গী-সাথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করো আর বিশ্বাস করো শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’- সূরা আন নেসা ৭৬। পক্ষ মাত্র দুটি। হয় মুমিন নয়তো কাফির। তৃতীয় পক্ষ যারা চুপ মেরে তামাশা দেখে এবং ভাবে ও দেখে কে বিজয়ী হয়? এমন ব্যক্তি ইসলামের কেহ নয়। এর বেশি কিছু বললাম না। একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসের অংশবিশেষ উল্লেখ করে ইতি টানতে চাই। হজরত হারেস আল আশয়ারী (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসের শেষাংশ ‘যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের দিকে লোকদের আহবান জানাবে সে জাহান্নামে যাবে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল (সা.), সালাত কায়েম ও ছিয়াম পালন করা সত্ত্বেও? আল্লাহর রসূল (সা.) বললেন, সালাত কায়েম ও ছিয়াম পালন এবং নিজেকে মুসলিম দাবি করা সত্ত্বেও’ -আহমদ ও তিরমিজি।

প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী  ০৯.০৫.২০২৫

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.