ইসলামে জুলুম ও জালিমের পরিণতি
ইসলামে জুলুম ও জালিমের পরিণতি কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
ইসলামে জুলুম ও জালিমের পরিণতি
কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
ভূমিকা
ইসলাম ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও মানবাধিকারের ধর্ম। মানুষের জান, মাল, ইজ্জত ও অধিকার রক্ষাকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এর বিপরীতে যুলুম বা অন্যায়-অত্যাচারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুলুম শুধু মানুষের ওপর নির্যাতন নয়; বরং আল্লাহর অধিকার লঙ্ঘন, মানুষের অধিকার নষ্ট করা, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্পদ আত্মসাৎ, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, বিচারে পক্ষপাত করা—এসবই যুলুমের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন ও হাদিসে জালিমদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির ঘোষণা এসেছে।
যুলুম কী?
আরবি “যুলুম” শব্দের অর্থ হলো—কোনো জিনিসকে তার যথাযথ স্থানে না রাখা, অন্যের অধিকার হরণ করা বা অন্যায় করা।
ইসলামী পরিভাষায়—
আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা কিংবা কোনো মানুষের অধিকার অন্যায়ভাবে ক্ষুণ্ণ করাই যুলুম।
যুলুমের প্রকারভেদ
১. আল্লাহর প্রতি যুলুম (শিরক)
সবচেয়ে বড় যুলুম হলো আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা।
“নিশ্চয়ই শিরক হলো মহা যুলুম।” (সূরা লুকমান : ১৩)
২. মানুষের ওপর যুলুম
অন্যের সম্পদ দখল করা, নির্যাতন করা, অপমান করা, মিথ্যা মামলা দেওয়া, ঘুষ, দুর্নীতি, শ্রমিকের হক নষ্ট করা ইত্যাদি।
৩. নিজের ওপর যুলুম
গুনাহের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া।
কুরআনে যুলুম সম্পর্কে সতর্কবাণী
১. আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না
“আর আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না।” (সূরা আলে ইমরান : ৫৭)
২. জালিমরা কখনো সফল হবে না
“নিশ্চয়ই জালিমরা কখনো সফলকাম হবে না।” (সূরা আনআম : ২১)
৩. জালিমদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি
“জালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা ইবরাহিম : ২২)
৪. আল্লাহ জালিমদের অবকাশ দেন
“তুমি কখনো মনে করো না যে, জালিমরা যা করছে সে সম্পর্কে আল্লাহ উদাসীন। তিনি তো তাদেরকে সেদিন পর্যন্ত অবকাশ দিচ্ছেন যেদিন চোখ স্থির হয়ে যাবে।” (সূরা ইবরাহিম : ৪২)
হাদিসে যুলুমের ভয়াবহতা
১. যুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে আসবে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “তোমরা যুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কেননা যুলুম কিয়ামতের দিন বহু অন্ধকারে পরিণত হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৮)
২. মজলুমের দোয়া অবশ্যই কবুল হয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “মজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৪৮)
৩. আল্লাহ নিজেও যুলুম হারাম করেছেন
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন—”হে আমার বান্দাগণ! আমি নিজের ওপর যুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কেও যুলুম হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর যুলুম করো না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৭)
৪. কিয়ামতের দিন মানুষের হক আদায় হবে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “কিয়ামতের দিন অবশ্যই প্রত্যেক হকদারের হক আদায় করা হবে। এমনকি শিংবিহীন ছাগলের জন্যও শিংওয়ালা ছাগল থেকে প্রতিশোধ নেওয়া হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮২)
জালিমের পরিণতি
১. দুনিয়ায় অপমান: যুলুমের মাধ্যমে সাময়িকভাবে ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জিত হতে পারে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত জালিম অপমানিত হয়।
২. মজলুমের দোয়া ধ্বংস ডেকে আনে: মজলুমের আহাজারি আল্লাহ সরাসরি গ্রহণ করেন। জালিম যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা পায় না।
৩. নেক আমল অন্যের কাছে চলে যাবে: যে ব্যক্তি মানুষের অধিকার নষ্ট করেছে, কিয়ামতের দিন তার নেক আমল মজলুমদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে মজলুমদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮১)
৪. জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা: মানুষের হক নষ্ট করলে শুধু তওবা যথেষ্ট নয়; যার হক নষ্ট করা হয়েছে, তার হক ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা ক্ষমা নিতে হবে।
যুলুম থেকে বাঁচার উপায়
১। সর্বদা আল্লাহভীতি (তাকওয়া) অবলম্বন করা।
২। মানুষের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা।
৩। বিচার ও সিদ্ধান্তে ন্যায়পরায়ণ হওয়া।
৪। ক্ষমতার অপব্যবহার না করা।
৫। কারও সম্পদ, সম্মান বা অধিকার ক্ষুণ্ণ না করা।
৬। ভুল হলে দ্রুত তওবা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির হক ফিরিয়ে দেওয়া।
৭। মজলুমের জন্য দোয়া করা এবং জালিমের পক্ষে অবস্থান না নেওয়া।
উপসংহার
যুলুম এমন একটি গুনাহ, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে। কুরআন ও সহিহ হাদিসে বারবার জালিমদের কঠিন পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একজন মুমিনের উচিত সব ধরনের যুলুম থেকে বেঁচে থাকা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ জালিমকে ছেড়ে দেন, কিন্তু অবহেলা করেন না। সময় হলে তাঁর বিচার অবশ্যম্ভাবী।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল প্রকার যুলুম থেকে হেফাজত করুন এবং ন্যায়পরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।
Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.