❝কুরবানির উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন❞
কুরবানি তাকওয়া অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের করণীয় দিক গুলো
❝কুরবানির উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন❞
প্রিয় পশু কুরবানির মাধ্যমে মুসলমানগণ আল্লাহর দরবারে তার ত্যাগকে উপস্থাপন করেন। মানব ইতিহাসের সাথে কুররবানির ইতিহাস ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আঃ) এর সময় থেকে কুরবানির প্রথা চালু রয়েছে। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোরবানি তারই পুত্র দ্বয় হাবিল ও কাবিলের দ্বারা সংঘটিত হয়।
আল্লাহর আদেশে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) আপন পুত্র ইসমাইল (আ:) কে কুরবানি করার ঘটনাকে স্বরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিম ধর্মালম্বীরা এই দিবসটি পালন করেন। হিজরি বর্ষপঞ্জি হিসাবে জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে ১২ তারিখ পর্যন্ত ৩ দিন ধরে ঈদুল আজহা চলে।
ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে আল্লাহর নির্দেশ পেয়েছিলেন যে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানি করার জন্য। সে অনুযায়ী তিনি উট/দুম্বা কোরবানি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি একই স্বপ্ন পূনরায় দেখলে বুঝতে পারেন আল্লাহ তাঁর কাছে কি চাচ্ছেন। তখন তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর নামে কোরবানি করার জন্য প্রস্তুত হন। এবিষয় যখন পিতৃভক্ত ইসমাইল জানতে পারেন তখন তিনি বলেন, ‘পিতা আপনি যা স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীল দেখতে পাবেন।’ অতপর মিনা পাহাড়ের পাদদেশে পুত্রের অনুরোধে ইবরাহিম (আ.) ইসমাইলের হাত-পা ও নিজের চোখ বেঁধে নেন এবং কন্ঠদেশে আল্লাহর নামে তরবারী চালান। দয়াময় আল্লাহ সেই সময় ইসমাঈলকে সরিয়ে নেন এবং তাঁর জায়গায় এক জন্তু-দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। নিশ্চয়ই এ ছিল ইব্রাহিম (আ.) এর জন্যে এক স্পষ্ট পরীক্ষা। অল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হওয়ার সুসংবাদ দেন।
ঈদুল আজহার দিনটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটানাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর আমাদের নিকট আসে। কিন্তু কেন তাহলে এই দিনটি ঈদ বা আনন্দের দিন? কারণ প্রিয় পুত্রকে জীবিত ফিরে পাওয়া ছিল ইবরাহিম (আ.) এর জন্য মহা আনন্দের। পৃথিবীর সকল পিতার ক্ষেত্রেই এটা সমান আনন্দের। যদি সেইদিন আল্লাহ ইসমাইল (আ.) কে কোরবানি হিসেবে কবুল করে নিতেন তবে হয়তো প্রত্যেক মুসলমানকেই তাদের পুত্র সন্তানকে কুরবানি করতে হতো, যদি তারা তা পালন করতো। আর তাহলে এই পৃথিবী থেকে মুসলিম জাতি বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ মহা জ্ঞানী, অসীম দয়ালু। তিনি আমাদের ইবরাহিম (আ.) এর মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করাননি এবং আমাদের আনন্দের সুসংবাদ দিয়েছেন।
হজরত ইবরাহিম (আ.) এর প্রতি এটা ছিল আল্লাহর মহা পরীক্ষা। পৃথিবীর বুকে এটাই ছিল স্রষ্টাপ্রেমে সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কোরবানি। আত্মত্যাগের সুমহান ও অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুহাম্মদির জন্য (যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে) পশু কুরবানি করাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাঁদের স্মরণে এ বিধান অনাদিকাল তথা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের (কোরবানির) গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো।’ (সূরা আল হজ : ৩৭)।
কুরবানি তাকওয়া অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের করণীয় দিক গুলো :
১. পশুর প্রতি সদয় আচরণ করা উচিত : প্রতি বছর ইদুল আযাহর দিনে শুধু বাংলাদেশেই কোরবানী হয় প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ পশু। মানুষের কল্যাণের জন্যই নিরীহ পশুগুলো প্রাণ হারায়। অল্লাহ এদেরকে আমাদের কাছে অসহায় করে দিয়েছেন। তাই এদের প্রতি সদয় আচরণ করা উচিত। লক্ষ্য করবেন কোরবানীর দিন বা আগের দিন সকালে অনেক পশুর চোখ বেয়ে পানি ঝরে। এটা হতে পারে সে তার অন্তিম পরিনতি বুঝতে পারে বা তার পালনকরীকে ছেড়ে আসার কারণে। কোরবানীর আগে তার গায়ে, গলায় হাত বুলিয়ে সহানুভুতি প্রকাশ করতে পারেন। তার কষ্ট লাঘবের জন্য মনে মনে আল্লাহর নিকট প্রার্থনাও করতে পারেন।
২. কুরবানির পশুর কোন কিছুই আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না : কোরবানির পশুর কোন কিছুই আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না, শুধু আপনার তাকওয়া ব্যতিত। তাই কত বড় বা ছোট পশু আপনি কোরবানি করবেন সেটা কোন বিষয় নয়। তবে কোরবানির পশু হতে হবে সুস্থ সবল এবং কোরবানির জন্য প্রাপ্ত বয়ষ্ক। আপনার কোরবানির উদ্দেশ্য যদি হয় লোক দেখানো, তবে তা- তা হিসেবেই গন্য হবে, কোরবানি হিসেবে নয়। আপনার কোরবানি করাটা লোক দেখানো কিনা তা বুঝার জন্য নিজেকেই প্রশ্ন করুন, “যদি নিয়ম এমন হতো যে কোরবানি করতে হবে সম্পূর্ন গোপনে, তবে কি আপনি অর্থ খরচ করে কোরবানি করতেন?” আমি মনে করি কোন মুসলমানই লোক দেখানোর জন্য কোরবানি করেন না। তবুও যখন দেখা যায় অনেক মানুষ যাকাত দিচ্ছেন না কিন্তু অধিক মূল্যের পশু কোরবানি করছেন, যখন যাকাত তাদের উপর ফরজ এবং কোরবানি করা ওয়াজিব ছিল, তখন কিছুটা দ্বিধায় পরতে হয় বৈকি।
৩. পালিত পশু কুরবানি করা শ্রেয় : যে কারণে কোরবানির প্রচলন হয়েছে তার মর্মার্থ একটু বেশি অনুধাবন করার জন্য নিজের পালিত পশু কোরবানি করা শ্রেয়। কেননা যখন একটি পশু আপনি লালন পালন করবেন স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রতি আপনার ভালবাসা জন্মাবে এবং সেটি আপনার প্রিয় একটি প্রাণীতে পরিণত হবে। আর আল্লাহ চেয়েছিলেন প্রিয় বস্তুকেই কুরবানি করার জন্য। তবে সবার পক্ষে পশু পালন সম্বব হয় না, তাই ক্রয়কৃত পশু কুরবানীতে কোন সমস্যা নেই।
৪. একমাত্র “আল্লাহর নামে” কুরবানি করা : কুরবানি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নামে নয় বরং একমাত্র আল্লাহর নামেই করতে হবে। পশু জবেহ করার সময় যদি আল্লাহর পবিত্র নাম তার উপর উচ্চারিত না হয় তবে তা কুরবানি বলে গন্য হবে না এবং তার মাংস খাবার জন্য হারাম হয়ে যাবে। আমাদের মধ্যে অনেকেই কোরবানি কাদের নামে হবে (যেমন ৭ ব্যক্তির নামে) তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরি। বস্তুত এটি হবে “কাদের পক্ষ” থেকে কুরবানি করা হচ্ছে একমাত্র “আল্লাহর নামে”। এ বিষয়টিতে সতর্ক হওয়া জরুরী।
কুরবানি দাতাদের করণীয় :
যারা কুরবানি দিবেন তাদের যিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে কুরবানী করার আগ পর্যন্ত নিজ শরীরের চুল ও নখ না কাটা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত এবং ফযীলতের কারণ। হাদীছ শরীফ-এ যদিও কুরবানী দাতার কথা উল্লেখ আছে তবে অপর হাদীছ শরীফ-এ যারা কুরবানী করবে না তাদের কথাও উল্লেখ আছে। অর্থাৎ উভয়ের জন্যই এ আমল। তাই যদি কারো চুল, নখ কাটার প্রয়োজন হয় তবে যেন যিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পূর্বেই কেটে নেয়। আর যিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে কুরবানী পর্যন্ত চুল, নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।
কুপ্রবৃত্তি পরিহার করা : পশু কেনার পর আপনি জিতেছেন না ঠকেছেন তার হিসেব করবেন না। আপনি জিতেছেন মানে হচ্ছে বিক্রেতা ঠকেছে। আপনার কি মনে হয় পবিত্র এই কাজে কাউকে ঠকানোর প্রবৃত্তি জড়িত থাকা উচিত? তাহলে কি এর পবিত্রতা নষ্ট হবে না?
ক্রয় বিক্রয়ে আল্লাহর সীমার মধ্যে থাকা : কোন কোন বছর বিভিন্ন কারণে বাজারে মন্দাভাব দেখা দেয়। এতে কোন কোন ব্যবসায়ী বা পশু বিক্রেতা ক্ষতির সম্মুখীন হন। ফলে তারা কম দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হন। তখন বিক্রেতাকে আপনি দুঃখিত দেখতে পাবেন। মনে করুন কোন কারণে বাজারে পশুর মূল্য কমে গেছে। আপনি সেই বাজার থেকে বা কোন বিক্রেতার কাছ থেকে কম মূল্যে পশু ক্রয় করলেন। বিক্রেতা নিরুপায় হয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হলো। আপনি নিজেও জানেন ক্রয়কৃত পশুর মূল্য আরো বেশি হওয়া স্বাভাবিক ছিল। এক্ষেতে ক্রয়কৃত পশুর মূল্য পরিশোধের পর আপনি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করুন তার সর্বসাকূল্যে (প্রত্যাশিত লাভ ব্যতিত) কত টাকা ক্ষতি হয়েছে। তার উত্তর যদি আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় তবে সম্ভব হলে তাকে ক্ষতির ঐ অর্থ দিয়ে দিন। এতে আপনি তাকে অনন্দিত দেখতে পাবেন এবং নিশ্চই এতে আল্লাহ আপনার উপর বেশি খুশি হবেন। অপর দিকে বিক্রেতাদেরও উচিত অত্যধিক লাভ না করা যার কারণে ক্রেতার কষ্ট হয়। তবে আপনি যদি ক্রেতা হন, মনে রাখবেন বিক্রেতার এটা হয়তো ব্যবসা, কিন্তু কুরবানি করাটা আপনার জন্য ব্যবসা নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
সামর্থ থাকলে একাই কুরবানি করা পারতপক্ষে ভালো : আপনার সামর্থ থাকলে একাই কুরবানি করতে পারেন। সামর্থ না থাকলে আপনার জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। সেক্ষেত্রে ইচ্ছে করলে আপনি অন্যদের সাথে অংশীদার হতে পারেন। আবার মনে করুন আপনার সামর্থ আছে এবং একাই কুরবানি করবেন ভেবেছেন। কিন্তু দেখাগেল আপনার পাশের কেউ আছে যার একার পক্ষে কোরবানি করা সম্ভব নয় কিন্তু কুরবানি করতে ইচ্ছুক কারো সাথে অংশীদার হয়ে। তবে সে খেত্রে তাকে আপনি আপনার অশীদার করে কুরবানি করার সুযোগ দিতে পারেন। এতে পারষ্পরিক ভ্রাতিত্ত্ব ও সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়, যা খুবই উত্তম। আশা করা যায় এতে কারোরই সওয়াব বা তাকওয়া অর্জনে ঘাটতি হবে না। কেননা আল্লাহর কাছে কুরবানির পশুর বস্তুগত কিছুই পৌঁছায় না শুধু যার যার তাকওয়া ব্যতিত। নিশ্চই আল্লাহ জানেন যা আমরা প্রকাশ্যে করি আর যা গোপনে।
Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.