Circle of Dawah

মুমিন জীবনে সময়ের গুরুত্ব

দারসূল হাদীস

মুমিন জীবনে সময়ের গুরুত্ব

عَنْ بنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهٍ صَلىَّ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ لِرَجٌلٍ وَهُوَ يَعِظُهُ : ” اِغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ شَبِابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ وَصِحَّتُكَ قَبْلَ سُقْمٍكَ وَغِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ وَحَياتَكَ قَبْلَ مَوْتٍك ” (أخرجه الحاكم في المستدرك رقم )7846

সরল অনুবাদ: প্রসিদ্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: কোন এক ব্যাক্তিকে রাসূল স: উপদেশ দেওয়ার সময় বললেন: তুমি পাঁচটি বিষয়ের পূ্র্বে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দাও। (১) বার্ধক্য আসার  পূর্বে তোমার যৌবনে গুরুত্ব দাও (২) অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে গুরুত্ব দাও (৩) দারিদ্রতা আসার আগে তোমার সচ্ছলতাকে গুরুত্ব দাও (৪) তোমার ব্যস্ততার পূর্বে তোমার অবসরতার প্রতি গুরুত্বারোপ করো (৫) এবং তোমার ‍মৃত্যু আসার আগেই তোমার জীবনের গুরুত্ব দাও। মুসতাদরিক ৭৮৪৬।

রাবী পরিচিতি: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হযরত নবী করিম (সা.) এর একজন বিখ্যাত সাহাবী । মহানবী (সা.) এর আবদুল্লাহ নামক চার জন বিশিষ্ট সাহাবী – যাদেরকে একত্রে عِبَادَلَةَ اَرْبَعَة ‘বলা হয়, তিনি তাদের অন্যতম । তিনি কুরাইশ বংশের হাশেমি শাখার সন্তান । হযরত রাসুলুল্লাহ (দ.) এর সর্বকনিষ্ঠ চাচা হযরত আব্বাস (রা.) এর জ্যেষ্ঠ ছেলে। তিনি নবী করিম (সা.) এর প্রিয় পাত্র ছিলেন । আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট সুবিজ্ঞ ফকিহ ও পবিত্র আল-কুরআনের তাফসীরের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় মুফাস্‌সির । মুসলিম বিশ্বে তাকে রইসুল মুফাস্‌সিরিন বা সাইয়্যিদুল মুফাস্‌সিরিন বলা হয় । অগাধ জ্ঞান পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি আরব জাতি তথা উম্মাতে মুহাম্মাদীর আল হিবর ও বাহর (পূণ্যবান জ্ঞানী ও সমুদ্র) উপাধি লাভ করেছিলেন। তাকওয়া ও পরহিযগারীর তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা।  কারণ যে কোন দ্বীনি জিজ্ঞাসার জবাব তিনি প্রজ্ঞার সাথে উপস্থাপন করতেন । এক অনন্য ইসলাম ধর্মবিশারদ বলে তাকে মনে করা হতো । আর এ জন্যেই তার উপাধি হিবরুল উম্মাহ্‌ ।

গ্রন্থ পরিচিতি: আলোচ্য হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল হাকেম আন নিসাপুরী কর্তৃক সংকলিত মুসতাদরিকে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, তাঁর এ গ্রন্থে সংকলিত হাদিসগুলো সহীহ এবং ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম যে পদ্ধতিতে হাদীস সংকলন করেছেন তিনিও তার গ্রন্থে হাদীস সংকলনে সেই পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন। অর্থাৎ রাবীর বিশ্বস্তা, ন্যায়পরায়ণতা, স্বরণশক্তি এবং হাদীসটি শাজ ও মুয়াল্লাল না হওয়া। কিন্তু আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের হাদীস বিশারদগনের মতে এই গ্রন্থে কিছু জয়ীপ ও জাল হাদীস রয়েছে।

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আল্লাহর রাসূল স: হাদীসের শুরুতে বলেছেন اِغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ অর্থাৎ পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে পাঁচটি  বিষয়কে গুরুত্ব দাও। তিনি চাইলে এখানে احفظ  অর্থাৎ সংরক্ষণ কর অথবা বলতে পারতেন اهتم অর্থাৎ গুরুত্ব দাও । যদিও হাদীসের শাব্দিক অর্থে اهتم তথা গুরুত্ব দাও অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত রাসূল স: বুঝাতে চেয়েছেন উল্লেখিত পাঁচটি বিষয় গনিমতের মতো যা মানুষ কোন রকম হিসেব ছাড়া লাভ করে। পবিত্র কুরআনে এই শব্দটি ব্যবহার হয়েছে গনিমত তথা যুদ্ধলব্দ সম্পদ হিসেবে। (গনিমত শব্দের ব্যবহারে আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَاعْلَمُوۤا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّن شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ  وَلِلرَّسُولِ وَلِذِى الْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ অর্থাৎ: আরো জেনে রাখ যে, যুদ্ধে যা কিছু তোমরা (গনীমত) লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রসূলের, রসূলের নিকটাত্মীয়, পিতৃহীন এতীম, দরিদ্র এবং পথচারীদের জন্য। (সূরা আনফাল: ৪১) । অত্র হাদীসে আল্লাহর রাসূল স: বুঝাতে চেয়েছেন যে গনিমতের সম্পদ যেমন মানুষ লুপে নেয়, সবছেয়ে দামিটাকে আগে প্রাধান্য দেয় তেমনি মানুষের উচিৎ তার জীবন চলার পথে উল্লেখিত পাঁচটি বিষয়ের আগে পাঁচটি বিষয়কে গনিমতের মত লুপে নেওয়া। মানুষ যেন এই পাঁচটি বিষয়কে আকর্ষণীয় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। গনিমতের মাল যেমন পিছনে ফেলে আসলে আর ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা তেমনি ‍উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ পাঁছটি বিষয় মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়া অসম্ভব  হয়ে পড়ে। অত্র হাদীসে রাসূল স: মানুষের জীবনের মৌলিক পাঁটি সময়কে উল্লেখ করে তার প্রতি গুরুত্বারোপের কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত : اِغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ شَبِابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ   তোমার বার্ধক্য আসার আগেই তোমার যৌবনের গুরুত্ব দাও। অর্থাৎ যৌবন নামক যে গনিমত তোমাকে আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন তা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তুমি তার ফায়দা লুফে নাও কারণ তোমার বার্ধক্য তোমাকে আর তোমার যৌবনে ফিরে আসতে দিবেনা। তুমি তোমার যৌবনেই আল্লাহর আনুগত্যে সময় ব্যয় কর। আল্লাহর রাসূল স: যৌবনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন কারণ এই বয়সেই মানুষ তার মনের মতো করে সবকিছু সাজিয়ে নিতে পারে। এই বয়স পার হয়ে গেলে সে তার জীবনের অসংখ্য চাহিদা পূরণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। একজন বৃদ্ধ যেমন যুবকের মতো হাড্ডি চিবিয়ে খাওয়া দেখে আপসোস ছাড়া আর কিছূই করতে পারে না। ঠিক তেমনি যৌবন পার হয়ে বার্ধক্যে এসে গেলে অসংখ্য অগনিত কাজের ইচ্ছা থাকা সত্তেও সে তা বাস্তবায়ণ করতে পারে না। কারণ তখন তার মন সায় দিলেও তার দেহ তাকে সায় দেয় না। তাই যৌবনের ইবাদতর প্রতি আল্লাহর রাসূল স: বলেছেন: سَبْعَةُ يُظِلِّهُمُ اللهُ فِيْ ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إلَّا ظِلَّهُ : إِمَامٌ عَادِلٌ ، وَشَابٌّ نَشَأْ فُيْ طَاعَةَ اللهِ ….رواه البخاريআল্লাহ রাব্বুল আলামীন কেয়ামতের ‍দিন সাত ব্যাক্তিকে তাঁর ছায়ায় ছায়া দিবেন যেদিন তাঁর ছায়া ব্যাতিত আর  কোন ছায়া থাকবেনা । তার মধ্যে প্রথম হলো ন্যায় পরায়ণ বাদশা আর দ্বিতীয় হলো যে তার যৌবন আল্লাহর আনুগত্য তথা ইবাদতে কাটিয়ে দিয়েছে… (বুখারী)। অন্য হাদীসে রাসূল স: বলেন

 لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ ، حَتَّى يَسْأَلَهُ عَنْ خَمْسٍ عن عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلَاهُ ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ ، وَفِيمَا أَنْفَقَهُ ، وَمَا عَمِلَ فِيمَا علم ـ ترمذي  অর্থাৎ : কোন বনী আদম কেয়ামতের দিন তাঁর রবের নিকট থেকে এক কদম ও নড়া ছড়াও পারবে না যথক্ষণ না সে পাঁছটি প্রশ্নের উত্তর দিবে একটি হলো সারাটা জীবন সে কোন পথে ব্যয় করেছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হবে তার যৌবনকাল কোথায় ব্যয় করেছে?…. (তিরমিজী)। আল্লাহর রাসূল স: অত্র হাদীসদ্বয়ে যৌবনের ইবাদতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন কারণ যৌবনে মানুষ যেভাবে প্রতিটি ইবাদত যথাযথভাবে করতে পারে পড়ন্ত বয়সে তেমন করতে পারে না। যৌবনকালে চাইলে হিমালয় পর্বত জয় করা সম্ভব কিন্তু বার্ধক্যে হিমালয় পর্বততো দূরের কথা সমতলে হাঁটতেও হাঁপিয়ে ওঠে। আজ আমাদের সমাজে যুব সমাজকে টার্গেট করে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের শয়তানী কার্যকলাপ পরিচালনা করে আসছে। এ অবস্থায় প্রতিটি যুবকের ‍উচিৎ তাদের শত্রূকে চেনা এবং তাদের এড়িয়ে চলা। সুতরাং যুবকদের উচিৎ যৌবন নামক সোনালী সময়কে গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। এবং ক্ষেত্রে সমাজে প্রতিষ্ঠিত সকল পাপাচার মুলৎপাটনে সর্বচ্ছো চেষ্টা করা।

দ্বিতীয়ত:  اِغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ صِحَّتُكَ قَبْلَ سُقْمٍكَ তোমার অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে গুরুত্ব দাও। সুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক বিশাল নেয়ামত। সুস্থ অবস্থায় একজন মানুষ যেভাবে ইবাদত করতে পারে অসুস্থ অবস্থায় সেভাবে পারে না। শুধু ইবাদতই নয়, মানুষ তার কোন কাজ-কর্মই সঠিকভাবে করতে পারে না। কখনো কখনো মানুষ তার প্রচন্ড অসুস্থতায় আল্লাহর হুকুমকে অমান্য করে। মানুষ যখন সুস্থ থাকে তখন সে এ সুস্থতাকে তেমন মূল্যায়ণ করে না। আর যখনই সে কোন রকম অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন সে চরম হতাশ হয়ে পড়ে ।সে মনে করে তার রোগটাই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন রোগ । তারা যন্ত্রনাই কঠিন যন্ত্রনা। অথচ সুস্থ থাকা অবস্থায় সে একে তেমন কোন রোগই মনে করতো না। এই কারণেই রাসূল স: বলেছেন:  نِعْمَتَانِ مَغْبُوْنٌ فِيْهِمِا كَثِيْرٌ مِنِ النَّاسِ: اَلصِّحَّةُ، وَالْفَرَاغُ (رواه البخاري)  মানুষের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ দুটি নেয়ামতের খুব অবহেলা করে- একটি হলো সুস্থতা অপরটি হলো অবসরতা (বুখারী)। অসুস্থতার আগে সুস্থতার গুরুত্ব ঐ পরীক্ষার্থীই সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারবে যে কিনা পরীক্ষার আগের দিন পড়বে বলে তার সকল পড়া জমা করে রেখে ছিল কিন্তু কোন কারণে সে পরীক্ষার আগের দিন এতো বেশি অসুস্থ হলো যে পড়াতো দুরের কথা পড়ার টেবিলেও বসতে পারেনি। তখন তার কাছে মনে হবে তার সুস্থতার সময়েই সে পড়াটা পড়ে রাখলে সবচেয়ে ভালো হতো। এজন্যই বলা হয়  “সুস্থতা স্বাস্থের মাথার উপর এমন একটা মুকুট যা অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া কেউ দেখতে পায়না”। সুতরাং প্রতিটি মানুষের ‍উচিৎ তার সুস্থতাকে গুরুত্ব দিয়ে সে তার রবের দেওয়া সকল দায়িত্ব পালন করে  নেওয়া। কারণ সুস্থ অবস্থায় ইবাদতের যে পরিপূর্ণতা আসে তা অসুস্থ অবস্থায় আসে না।

তৃতীয়ত: اِغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ غِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ অর্থাৎ তোমার দারিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে গুরুত্ব দাও। একজন প্রকৃত বুদ্ধিমান ধনী কখনই তার ভবিষ্যত সম্পর্কে উদাসীন থাকে না। সে তার আগত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তার অর্জিত সম্পত্তির পুরোটাই ব্যয় না করে কিছু কিছু করে সে সঞ্চয় করে রাখে। অথবা তার অতীব প্রয়োজনীয় কাজ গুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সে তার সচ্ছলতার সময় সম্পন্ন করে ফেলে। ঠিক তেমনি একজন সচেতন মুমিন মুসলিমও তার সচ্ছলতার সময় সে তার সম্পত্তি থেকে আল্লাহর রাহে দান করে,গরীব অসহায় মানুষের প্রতি দয়া করে তার মৌলিক ইবাদত তথা যকাত আদায় করে, হজ্জ পালন করে। বুদ্ধিমান সে মহান আল্লাহ তায়ালার দেয়া বিশেষ অফার গ্রহণ করবে আল্লাহ তায়ালা বলেন:مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍأَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيم ( অর্থাৎ আল্লাহর পথে যারা তাদের সম্পদ থেকে দান করে তাদের দানের ‍উদাহরণ হলো একটি বীজের মতো যা বপন করার পর তা থেকে সাতটি শীষ বের হয় আর প্রতিটি শীষ থেকে বের হয় আরো একশত দানা। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা যাকে চান তাকে দ্বিগুন করে দেন। আর আল্লাহ তায়ালা বিশাল  ও মহাজ্ঞানী ( সূরা আল বাকারা: ২৬১)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:وَأَنفِقُوا مِن مَّا رَزَقْنَاكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَىٰ أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ الصَّالِحِين- وَلَن يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا ۚ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ  অর্থাৎ :আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে তোামাদের কারো মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। (তখন আল্লাহ প্রতিত্তরে বলবেন) প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন। (সুরা মুনাফিকুন: ১০-১১)। অতএব সচেতন ও সচ্ছল মুমিনের উচিৎ তার মৃত্যু বা অসচ্ছলতা আসার আগেই  সে আল্লাহর পথে তার সম্পদ দান করবে।

চতুর্থত: اِغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ অর্থাৎ তুমি তোমর ব্যস্ততা আসার আগে তোমার অবসরতাকে গুরুত্ব দাও। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে তার অবসরতাকে। অবসর সময়তে মানুষ বেশি আল্লাহর থেকে বেশি গাফেল থাকে। একারণে আল্লাহর রাসূল স: বলেছেন: صلى الله عليه وسلم نعمتان مغبون فيهما كثير من الناس الصحة والفراغ    قال  ( রাসূল স: বলেছেন: দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে মানুষ সবচেয়ে বেশি বেখবর! একটি হলো তার সু-স্বাস্থ্য অপরটি হলো অবসরতা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা তার রাসূল কে লক্ষ করে বলেন: فَإِذَا فَرَغْتَ فَٱنصَبْ، وَإِلَىٰ رَبِّكَ فَٱرْغَب (কাজেই যখনই অবসর পাও ইবাদতের কঠোর শ্রমে লেগে যাও। এবং নিজের রবের প্রতি মনোযোগ দাও। ( সুরা ইনশিরাহ: ৭-৮)। সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের উচিৎ তার সময়কে যথাযথ কাজে লাগানো এং অবসরতাকে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে ব্যয় করা। কারণ তাকে অযথা অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন: أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ তারা কি ধারণা করে নিয়েছে তাদের অনর্থক সৃষ্টি করা হয়েছে । তাদেরকে আমার দিকে ফিরে আসতে হবেনা? ( সূরা আল-মুমিনূন: ১১৫)  অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন: أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ মানুষকে ধারণা করে নিয়েছে তাকে এমনিতে ছেড়ে দেওয়া হবে। (সূরা কেয়ামাহ : ৩৬)

পঞ্চমত: اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ حَياتَكَ قَبْلَ مَوْتٍك অর্থাৎ তোমর মৃত্যু আসার আগে তুমি তোমার জীবনকে গুরুত্ব দাও। কেননা যখন মৃত্যুর দূত আসবে তখন কোন অযর আপত্তিই মানুষকে তার মৃত্যু থেকে রক্ষা করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَأَنفِقُواْ مِن مَّا رَزَقْنَاكُمْ مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِىَ أَحَدَكُمُ ٱلْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلاۤ أَخَّرْتَنِيۤ إِلَىٰ أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ ٱلصَّالِحِينَ، وَلَن يُؤَخِّرَ ٱللَّهُ نَفْساً إِذَا جَآءَ أَجَلُهَآ وَٱللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ অর্থাৎ: আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন।(সুরা মুনাফিকুন: ১০-১১) যখন মানুষের নিকট মৃত্যু উপস্থিত তখন ‍দুনিয়াতে আল্লাহকে অস্বীকারকারীগন আল্লাহর কাছে দুনিয়ার আবার দুনিয়াতে ফিরে আসার ‍সুযোগ প্রার্থনা করবে। নষ্ট করে ফেলা  কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা প্রত্যখ্যান করবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:  حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ۚ كَلَّا ۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا ۖ وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ অর্থাৎ যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলেঃ হে আমার পালণকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে ) প্রেরণ করুন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। (সূরা আল মুমিনূন: ৯৯-১০০)। সূতরাং কোন বিবেকবানের উচিৎ নয় সকালে তার কাজের জন্য বিকেলের অপেক্ষা করা। কারণ হতে পারে আজকের সকালটিই তার জন্য শেষ সকাল আর হয়তো বিকাল খুঁঝে পাবেনা। হযরত আলী রা: বলেন: الناسُ نِيَامٌ فإِذا مَاتُوا انتَبَهُوا : অধিকাংশ মানুষ তার মৃত্যুর ব্যাপারে উদাসীন, যখনই তার মৃত্যু আসে তখন সে হাহুতাস করতে করতে লজ্জিত হয়। সে ভাবে আগামী কাল সে ভালো কাজ করবে। অথবা আজকের পর থেকে সে আর মন্দ কাজ করবে না। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো তার মৃত্যু হঠাৎ এসে তার সকল পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। বাংলায় প্রবাদ আছে “সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়”। কেয়ামতের মাঠে যখন সব কিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে তখন অবিশ্বাসীগণ আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাবে তাদের আবার দুনিয়াতে পাঠাবে, তারা দুনিয়ায় এসে সৎকাজ করে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করবেন। আল্লাহ তায়ালা তাদের কথাকে কুরআনে এভাবে উল্লেখ করেছেন وَلَوْ تَرَىٰ إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِندَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا  مُوقِنُونَ অর্থাৎ (হে রাসূল) যদি তুমি দেখতে! অপরাধীরা যখন তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে মাথা নত করে বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা দেখলাম ও শুনলাম এখন তুমি আমাদের পুনরায় (পৃথিবীতে) পাঠিয়ে দাও, আমরা সৎকাজ করব। নিশ্চয়ই আমরা (এখন) দৃঢ় বিশ্বাসী (সূরা আস সাজদাহ : ১২) । মোদ্দা কথা হলো জীবনের প্রতিটি সময় আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নেয়ামত, এটি মানুষের জীবনে অমূল্য সম্পদ। যার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা সূরা আসরের শুরুতে শপথ করেছেন। তাছাড়া আরো বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ তায়ালা দিনের শপথ ,কখনো রাতের শপথ, আবার কখনো দ্বি-প্রহরের সময়ের শপথ, কখনো মধ্য রাতে,আবার প্রভাতের শপথ করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বোঝাতে চেয়েছেন মানব জীবনে সময়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। ইমাম রাজী রহ: সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে সূরা আসরের তাফসীরের কথা উল্লেখ করে বলেন: আমি একদিন বাজারে গিয়ে দেখি এক বরফ বিক্রেতা চিৎকারে করে বলেন কে আছ পুঁজি হারানো লোকটির প্রতি রহম করো। অর্থাৎ সূর্য্ উঠার সাথে সাথে তার বরফ গলতে শুরু করছে। অর্থাৎ তার পুঁজি গলে যাচ্ছে। আমাদের জীবনের সময় বরফ খন্ড গলার মতো যা প্রতিনিয়ত ইতিহাসের অতর গহবরে হারিয়ে যাচ্চে। সুতরাং প্রতিটি মানুষের উচিৎ তার জীবনের প্রতিটি সময়েকে গুরুত্ব দেওয়া।

হাদিসের শিক্ষা: সময়ের যথাযথ ব্যবহার করা। কাজটি আজ নয় আগামী কাল করব, এমন কথা না বলা। আখেরাতের চিন্তা নিয়ে সময়ের সৎ ব্যবহার করা। ইবাদতের জন্য আগামীকালকে নির্ধারণ না করা।

হাফেজ মাও: নূরুল হুদা

কুরানিক সায়েন্স এন্ড ইসলমিক স্টাডিজ

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.